বই: জ্ঞানের দীপ্তিময় দীপশিখা

সূচিপত্র

মানবজীবনে বই এক পরম বন্ধু, পরম আশ্রয়। একটি ভালো বই পথ দেখায় অন্তরজগতকে, মেলে ধরে জীবনের বন্ধ দরজা-জানালার কপাট। বইয়ের বিকল্প নেই আলোকিত হওয়ার পথে। এর প্রতিটি পৃষ্ঠায় সঞ্চিত থাকে হাজার বছরের জ্ঞান-সাগরের কল্লোল; অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন।

বই প্রসারিত করে চিন্তার দিগন্ত, জাগিয়ে তোলে হৃদয়ের গভীরে নিহিত মানবতা। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে যাত্রা করতে চাইলে, বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়াই একমাত্র পথ। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজনীতি—সব মিলিয়ে বই এক অফুরন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার।

তথ্যপ্রযুক্তির ঝলমলে এই যুগে নতুন প্রজন্ম বইয়ের সঙ্গ ত্যাগ করছে, ভুলে যাচ্ছে পাতায় পাতায় লুকিয়ে থাকা জীবন-প্রবাহের মর্মবাণী। অথচ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জগৎকে বিস্তৃত করতে হলে বই পাঠে মনোযোগী হওয়াই শ্রেয়।

একটি ভালো বই অশান্ত মনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। অবসর কিংবা অবকাশে বই হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, ভাবনার বাহন। বইয়ের ছত্রে ছত্রে আছে মনের খোরাক, চিন্তার অমৃত। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আনন্দ বই পাঠেই অনুধাবন করা যায়।

নিয়মিত পাঠচর্চাই গড়ে তোলে পরিপূর্ণ মানুষ। পাঠচর্চার অভাব মানুষকে বঞ্চিত করে জ্ঞানের সুধা থেকে। যথার্থ শিক্ষিত হতে চাইলে চাই মনের প্রসারতা—আর সে প্রসারতা অর্জন সম্ভব বইয়ের গভীরে ডুবে গিয়ে।

সারা বছরই চাই বইয়ের সান্নিধ্য। কারণ, পাঠ মানেই জ্ঞানের সরোবরে একাগ্র ডুব।

তাই বলি—

পড়, পড়, পড়—আরও পড়!

বিজ্ঞানের গবেষণাই সাক্ষ্য দেয়—মানবমস্তিষ্কে লুকিয়ে আছে এক বিপুল জ্ঞানের ভাণ্ডার, যা অধিকাংশ সময় সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এই সুপ্ত জ্ঞানকে জাগ্রত ও বিকশিত করতে প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, মননের গভীর অনুশীলন।
আর এই চর্চার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম—বই

চোখের সামনে মেলে ধরা একটি বই মানুষকে নিয়ে যেতে পারে কল্পনা ও চিন্তার এক বিস্তীর্ণ জগতে, যেখানে সে অনুভব করে অনাবিল আনন্দ, উদিত হয় আত্মজিজ্ঞাসা। বই পাঠে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে নতুন চোখে, অনুভব করে সমাজ ও অন্য মানুষের হৃদয়ের অনুরণন।

এই অভিজ্ঞতা টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটার দিতে পারে না। কারণ, সেখানে শব্দ, সুর, ছবি, রঙ ও জীবন্ত উপস্থাপনায় সবকিছু আমাদের চোখের সামনে তৈরি করে তুলে ধরা হয়। চিন্তা করার বা কল্পনা সেখানে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ভাবনার দুয়ার খোলা রাখে না এই মাধ্যমগুলো—তারা কল্পনার পরিসরকে সংকুচিত করে দেয়।

কিন্তু বই
সে তো কেবল কাগজের উপর ছাপা কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়,
বই মানে মানুষের ভাবনার বিশুদ্ধ প্রকাশ,
কল্পনার স্বচ্ছ আকাশে অবাধ ডানামেলা।

অন্য সকল মাধ্যম যেখানে তথ্য, তত্ত্ব ও উপস্থাপনার মিশেলে গঠিত এক জটিল বুনন,
সেখানে বই
একক, নিখাদ, অকৃত্রিম।

এ যেন আত্মার সঙ্গে আত্মার মৌন সংলাপ,
একটি জীবন্ত আত্মবিশ্বাস,
যা পাঠকের অন্তরকে করে আলোকোজ্জ্বল,
মুক্ত করে এক নতুন বোধ ও অনুভবের জগতে।

I am so small I can barely be seen How can this great love be inside me? Look at your eyes, they are small But they see enormous things.”

বই হলো রুমীর চোখের মত, অতি ক্ষুদ্র অথচ চারপাশের সবকিছুকে বৃহদাকারে দেখতে পায়।

বলা হয় সাহিত্য সমাজ বদলের হাতিয়ার। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে কথাটি অবশ্যই সত্যি। তাই সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে বেশী বেশী বই পড়া হলে আমরা আমাদের মানসিকতার উন্নয়ন ঘটাতে পারবো।

টলস্টয়ের সেই ঐতিহাসিক উচ্চারণ আজও প্রাসঙ্গিক—

“মানব জীবনের তিনটি অনুষঙ্গ—বই, বই, এবং বই।”

এ যেন জ্ঞানের এক অনন্ত ত্রিমূর্তি, যার প্রত্যেকটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের মানসিক উৎকর্ষ।

পারস্যের মহাকবি ওমর খৈয়াম গভীর উপলব্ধিতে লিখেছেন—

“মদ ফুরোবে, রুটি হবে শেষ, প্রিয়ার কালো চোখও একদিন হারাবে মায়া; তবু বই থাকবে—চিরযৌবনা, অনন্ত নবীন।”

এই চিরন্তন বাক্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সময় ক্ষয় হয়, রূপ ম্লান হয়, কিন্তু বইয়ের দীপ্তি কখনও নিঃশেষ হয় না।

যুগে যুগে, কালে কালে, সভ্যতার বহতা স্রোতে বই-ই ছিল আলোর মশাল, পথের দিশারী। মানুষের চিন্তা, চেতনা, ও চিরন্তন জিজ্ঞাসাকে বই-ই করেছে স্থায়ী ও সংরক্ষিত।

আর কে না জানে সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই অমর উক্তি—

“বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।”

বরং বই কেনা মানে আত্মাকে সমৃদ্ধ করা, চিন্তাকে প্রসারিত করা, আর হৃদয়কে নির্মল করে তোলা।

বই—তা শুধু কাগজের পাতায় বাঁধা কিছু শব্দ নয়,
এ এক জীবন্ত আলো,
যা নিভে না কখনও।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সূচিপত্র

অনুসন্ধান করুন

সর্বশেষ পোস্ট

সাবস্ক্রাইব

আপনার প্রিয় বইটি যেন মিস না হয় — এখনই আমাদের মেইলিং লিস্টে যুক্ত হোন।