লেখকের দায় ও কলমের দায়িত্ব
সূচিপত্র
—একটি সময়োপযোগী আত্মজিজ্ঞাসা
একটি বাক্য বদলে দিতে পারে একটি সম্পর্ক, গড়ে দিতে পারে একটি সমাজ, এমনকি উন্মোচন করতে পারে একটি নতুন ইতিহাস। আবার, একটি কটু বাক্য ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে হৃদয়ের পর্দা, ঝলসে দিতে পারে শতভাগ আস্থা।
আমরা প্রতিদিন কথা বলি। অনেকে কলম ধরেন, কেউ লিখে যান দিনের ডায়েরি, কেউ রচনা করেন জাতির বিবেক। কিন্তু আমরা কয়জন ভাবি, এই বলা কিংবা লেখা কেবল শব্দের খেলা নয়—এ এক অপরিসীম দায়, এক অদৃশ্য দায়িত্ব?
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“আপনি আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন সর্বোত্তম কথাবার্তা বলে। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করে।”
(সূরা বনী ইসরাঈল: ৫৩)
বলা হয়নি, ভালো কথা বলো; বলা হয়েছে, সর্বোত্তম বলো। কেননা, শব্দ কখনো তিরের চেয়েও অধিক গভীর আঘাত হানে। তাই তো বলা হয়, জিহ্বার ধার অনেক সময় তরবারিকেও হার মানায়।
কিন্তু, শুধু মুখের কথা?
না। কলম—এই ক্ষুদ্র বস্তুটিই তো একেক সময় বিস্ফোরক শক্তি ধারণ করে! একটি কলমের খোঁচায় সৃষ্টি হতে পারে সভ্যতার বিপ্লব, ন্যায়বিচারের সুর্যোদয়। যে কলম আল্লাহর নামে চালিত হয়, তা হয়ে ওঠে আলোর মশাল, অন্ধকারের মাঝে এক বিশুদ্ধ বার্তা।
কলমের কসম
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“নূন। কলমের শপথ এবং যা কিছু তারা লিখে।”
(সূরা ক্বালাম – ১)
এই আয়াতে কেবল কলমের শপথ নয়, এর মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে—কলম শুধু লেখার যন্ত্র নয়, বরং এক মহামূল্যবান আমানত, এক অবিচল দায়িত্ব। যে জানে কীভাবে কলম চালাতে হয়, তার উচিত—তাকে আল্লাহ যা শিখিয়েছেন, তা গোপন না করা।
আমাদের পূর্বসূরিগণ—ইমাম গাযযালী, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইমাম নববী—তাঁদের কলমের জ্বালানিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম উজ্জীবিত হয়েছে। একেকটি পাণ্ডুলিপি যেন দাওয়াহর শিখা হয়ে পথ দেখিয়েছে হাজারো মানুষকে।
আজকের কলম
আজ, যখন শব্দের অপব্যবহার সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে, তখন দরকার সত্যপ্রেমী, দায়িত্বশীল, আল্লাহভীরু কলমধারীর। দরকার এমন এক কলম, যা সত্যের পক্ষে আপসহীন, যা মিথ্যার মুখোশ ছিঁড়ে প্রকাশ করে হকের মুখাবয়ব।
আমরা দেখতে পাই—একজন লেখক, যদি আত্মশুদ্ধির চর্চায় লিপ্ত না থাকেন, তবে তার কলম সহজেই হয়ে উঠতে পারে প্রতারণার হাতিয়ার। শব্দের অলংকারে সে সাজিয়ে দিতে পারে মিথ্যাকে, আর সত্যকে আড়াল করে ফেলতে পারে মোহের পর্দায়।
ঠিক এমন অবস্থাতেই লেখকের কাছে সমাজ প্রত্যাশা করে—সে যেন নিজের কলমকে বানায় আল্লাহর আদেশের অনুসারী, আর হকপন্থার দিশারী।
লেখকের আত্মা
লেখক যখন লেখেন, তখন তা কেবল তার ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; বরং সেই লেখা হয়ে ওঠে পাঠকের দুঃখ-কষ্ট, আশা-নিরাশার প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যের প্রকৃত রূপ তখনই উন্মোচিত হয়, যখন লেখক মানুষের হৃদয়ে ঢুকে পড়ে, অনুভব করে তাদের কান্না, তাদের লড়াই।
একজন সত্যিকারের লেখক নিজেকে দেখতে পান তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের আয়নায়। তার কলমে জেগে ওঠে পথচারীর ক্লান্তি, মায়ের দোয়া, শিশুর স্বপ্ন, মজুরের ঘাম।
সে যেন এক মহীরুহ—যার শিকড় বিস্তৃত সমাজের অন্তস্তলে, আর শাখা-প্রশাখা ছুঁয়ে যায় ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, মানবতা এবং চেতনার উচ্চতম শিখর।
ফিতনার দিনে কলম থামে না
যখন চারপাশে মিথ্যা মেঘের মতো ঢেকে ফেলে সত্যকে, যখন বিভ্রান্তি পুঁতে দেয় অপসংস্কৃতির বীজ, তখনো সৎ লেখকের কলম থেমে থাকে না। বরং তখন সে হয়ে ওঠে আগুনজ্বালানো দীপশিখা, আঁধারের বুকে পথ দেখানো এক দীপ্ত নাবিক।
তাকে দেখে পাঠক বুঝে, ‘না, এখনো কেউ আছে, যে কলম দিয়ে গড়ে তোলে আস্থা, ভালোবাসা ও দিশা।’
শেষকথা: লেখক হওয়া মানে দায়বদ্ধ হওয়া
লেখক হওয়া মানে শুধু শব্দ সাজানো নয়; বরং তা এক মহৎ দায়িত্ব। এই দায়িত্বের উৎস আল্লাহর দেয়া নেয়ামত—জ্ঞান, বোধ, ভাষা ও প্রকাশ ক্ষমতা।
তাই আমাদের প্রত্যেক লেখকের উচিত—এই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করা হক, ন্যায় ও সৌন্দর্যের বার্তাবাহক হয়ে।
আমরা যেন এমন কলমধারী হই, যার কালি ঢালে আলো, যার শব্দ গড়ে তোলে চেতনা, যার ভাষা জাগায় সাহস।
কলম হোক নিয়ামত, কলম হোক আমানত। কলম হোক আল্লাহর পথে এক অবিনাশী সফর।
শেয়ার করুন
Poro Prokash
সম্পর্কিত পোস্ট
সূচিপত্র
অনুসন্ধান করুন
সর্বশেষ পোস্ট

বই সাজানোর দারুণ কিছু কৌশল

বই: জ্ঞানের দীপ্তিময় দীপশিখা

লেখকের দায় ও কলমের দায়িত্ব

সাবস্ক্রাইব
আপনার প্রিয় বইটি যেন মিস না হয় — এখনই আমাদের মেইলিং লিস্টে যুক্ত হোন।